আংগুল দিয়ে কথা
- JOHN OVI ROZARIO
এতোদিন আমি জানতাম, মানুষ কথা বলে মুখ দিয়ে। কিন্তু, এই বিংশ শতাব্দীতে এসে অনেক উদ্ভট উদ্ভট কত কিছু জানতে পারলাম। মানুষ এখন আংগুল দিয়ে টিপে টিপে ম্যাসেঞ্জারে এবং অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চ্যাটিং করাকেই বলে 'কথা বলা'। কানে ফোন দিয়ে কথা বলা যায় দেখেছি, তাই বলে আঙুল দিয়ে? কথা যদি আংগুল দিয়েই বলা যেতো তবে, মুখের সৃষ্টি কি আদৌ আমাদের হতো??
২০০৯-১০ সাল পর্যন্ত আমাদের এই বাংলাদেশ ছিল পৃথিবীর গরীব দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। দেশের আয় ও উন্নতির বিকাশের অন্যতম ভূমিকায় ছিল তখন বাংলাদেশের প্রবাসীরা। কিন্তু, তাদের সাথে পরিবারগুলোর যোগাযোগের মূল রাস্তা ছিল চিঠিপত্র। থাকলেই বা কি হবে? সেই সময়গুলোতে তো প্রবাসীদের বেশির ভাগই অক্ষর জ্ঞাণ বলতেও ছিলো না। আবার অন্যদিকে, এনালগ টেলিফোন ছিলো যোগাযোগ করার অন্য আরেকটি মাধ্যম, যার খরচ বহন করার ক্ষমতাও দুঃসহ ছিল।
আমাদের দেশের অতীত ঘাটলে দেখা যাবে যে, সেই সময় মধ্যপ্রাচ্যে টেলিফোনে কথা বলতে গেলে মিনিট প্রতি ৩০-৮০ টাকা ব্যয় হতো, যুক্তরাষ্ট্রে লাগতো ৫০-১০০ টাকা, যুক্তরাজ্যে ৮০-১২০ টাকা; অনেক অনেক দেশে আরো বেশী লাগতো। সেই সুবাদে প্রযুক্তি আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা এত সহজলভ্য এবং সাশ্রয়ী করে দিয়েছে, যাতে আমরা কম খরচে নিজের আপন মানুষজনের সাথে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বা যোগাযোগ বজায় রাখতে পারি।
প্রযুক্তির সমস্ত সৃষ্টির উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রয়োজন মেটানো। তবে আমরা কি প্রয়োজনীয় ব্যবহারে আজ মোবাইল ফোন ব্যবহার করছি? না করছি না। এখন মনে হচ্ছে, আগেই ভালো ছিলো। অন্ত্যত মিনিট প্রতি কথার মূল্য ছিল, আর এখন কোন টাকাই লাগে না ভেবে কথার মূল্য যেন চলে গেছে সরে সবার মধ্যে থেকে। এর মূল কারণ, অপ্রয়োজনীয় আলাপ, অথবা সময় কাটানো।
চ্যাটিং -এর উৎস হচ্ছে চিঠি; কিন্তু, কাগজে নয়, মোবাইলের মাধ্যমে সরাসরি বার্তা আদান-প্রদান। আমরা কি একই সাথে ৮ টা চিঠি পড়তে পারি। তা সম্ভব নয়। একটা একটা করে পড়তে হবে, চিঠিগুলো বুঝতে। অন্যদিকে, চ্যাটিং কি একটা একটা করে করি আমরা? নাহ করি না, একই সাথে সবার সাথে করি । একমাত্র এই কারণে আমরা কোন মানুষকেও মূল্য দিতে পারিনা এখন; মানুষের পরিস্থিতি বা মন'ও কেউ বুঝিনা, অনেকটা অবহেলা থাকে, পাত্তা দেয়া হয় না কাউকেই সমান। কারণ, এক একজন এক এক রকম মনোভাব প্রকাশ করে।
শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় তাগিদে যদি সঠিক উপায়ে আমরা প্রযুক্তি ব্যবহার করি, তবে আজ আমাদের দেশে এতো হানাহানি, ভুল বুঝাবুঝি, ভালোবাসার ভাংগন ইত্যাদি কষ্টগুলো পেতে হতো না। ফোন আছে বলেই যে আমাদের কথা চালাতে হবে তা ভুল, এতে নিজেরই ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ হচ্ছে। তারপর আবার, কথা বলি এখন আংগুল দিয়ে। কোন কিছু পড়তে গেলে তা সেভাবেই আমরা পড়ি, যেভাবে আমাদের মনের পরিস্থিতি বিরাজমান থাকে। কারো সামনাসামনি কথা বলতে গেলে পরে, আমরা তাদের চেহারা দেখে তাদের পরিস্থিতির ধারণা পাই, আর তাই বুঝতে পারি কেমন আচরণ সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু, ফোনে কথা বলে অনবরত এবং চ্যাটিং-এ মেতে থেকেও সারাক্ষন, আমরা কি কারো পরিস্থিতি বিবেচনা করতে পারি? আগে মানুষ মনের টানে চলে যেতো অন্য আরেকজনকে দেখতে ও কথা বলতে। ফোন নিয়েই যদি মেতে থাকি আর ভালোবাসার প্রকাশ এবং প্রচারণা চালাই, তবে সেটা ফোনের টান, মনের না; মূল কথা হচ্ছে - কোন কিছু নিয়ে ব্যস্ত হতে পারছিনা বিধায় ফোনে সময় কাটাচ্ছি, ইংরেজিতে যাকে বলে TIME PASS.
আজ আমরা শখের বশে স্বন্তানের হাতেও তুলে দিচ্ছি ফোন, গড়ে তুলছি করে যন্ত্র। যেখানে তাদের জানবার কথা প্রকৃতির সব কথা, সেখানে তারা জানছে যান্ত্রিক সব প্রথা। প্রয়োজন মেটান, সময় না ঘুচিয়ে; তাহলেই সমাজ ফিরে আসবে, মানুষের ভালোবাসাগুলোরও ভাংগন হবে না। মিথ্যা বলার চর্চাও কমে যাবে। কথার মূল্য বাড়বে।। ধন্যবাদ।।


